চুমু বা আদরের আড়ালে শৈশবের অস্বস্তি ও ট্রমার গল্প 

সুলতানা স্বাতী
২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০

গাজীপুরের টঙ্গীর কারীউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছয় বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে চুমু দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি ওই শিশুর ভালো লাগেনি। সে বাড়িতে বলে দিয়েছে। শিশুর বাবা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে বিচার চাইতে গেছে। তখন তর্কবিতর্কের একপর্যায়ে শিশুর বাবা শিক্ষককে চড় মেরেছেন। ঘটনা এতটুকুই। তো এই ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।

আসলে কি এতটুকু ঘটনা? আচ্ছা আমরা যখন স্কুলে পড়তাম, তখন কোনও শিক্ষক কি আমাদের জড়িয়ে ধরেছেন? চুমু দিয়েছেন? ভালো রেজাল্ট করলেও কি আদর করেছেন? ছোটবেলায় কোনও শিক্ষকের কোলে উঠেছি, এমন দৃশ্যও স্মৃতিতে নেই। তবে ভালো রেজাল্ট করলে শিক্ষক খুশি হতেন। বিষয়টা আমরা ঠিকই বুঝতাম। আবার কোন শিক্ষক একটু বেশি প্রশ্রয় দিচ্ছেন, কে বেশি কড়া, তাও বুঝতাম। এর জন্য জড়িয়ে ধরা বা চুমু দেওয়ার দরকার হতো না।

আচ্ছা, ‘ধরা যাক আমি একটা ৬ বছরের শিশু। ছেলে বা মেয়ে যা-ই হই না কেন,আমাকে যে জড়িয়ে ধরছেন, চুমু দিচ্ছেন, অনুমতি নিয়েছেন? আমি ছোট হলেও শরীরটা কিন্তু আমারই।’ একটা শিশু এই কথাগুলো হয়তো স্পষ্ট করে বলতে পারে না। কিন্তু বিষয়টা যে স্বস্তিকর নয়, তা বুঝে। নইলে মাদ্রাসার ওই শিশুটি গিয়ে তার পরিবারকে বলতো না। আর একটি বিষয়, এই পরিবার হয়তো সচেতন। কিন্তু সব শিশু অভিযোগ করে না। বাবা-মাকে গিয়ে বলে না। আবার অভিযোগ করলেও বাবা-মা অনেক সময় তা পাত্তা দেন না।

তো সেই শিশুটি একটা অস্বস্তি, একটা ভয় নিয়ে সারা জীবন কাটিয়ে দেয়। বাবা-মায়ের বা অন্য কোনও অভিভাবকের সাপোর্ট পেলে কোনও কোনও শিশু শৈশবের এসব ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু কারও সাপোর্ট না পেলে শিশুটি পরবর্তীকালে বিশ্বাস করতে ভয় পায়। তার আত্মবিশ্বাস নষ্ট হতে থাকে।

আবার পড়াশোনায় মনোযোগ থাকে না। তার ঘুম-খাওয়া কিছুই ঠিকমতো হয়ে ওঠে না। সারাক্ষণ তাকে একটা ভয় তাড়া করে বেড়ায়। অনেক সময় এই ঘটনার জন্য সে নিজেকে দায়ী বা দোষী ভাবতে থাকে। অন্য কারও সাথে তো হচ্ছে না। তার সাথেই কেন ঘটছে! বাবা-মাকে শুধু নয়, নিজেকেও ঘৃণা করতে থাকে শিশুটি। নিজেকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিতে থাকে। কেউ কেউ সারা জীবন এই ক্ষত বয়ে বেড়ায়। বড় হলে বিয়ে করতে ভয় পায়। কর্মজীবনে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে না। চুপচাপ সব মেনে নিতে শেখে। তার অ্যাডজাস্টমেন্টে  সমস্যা হয়।

তো ঘটনা কিন্তু মোটেই ছোট নয়। যে বাবা শিক্ষককে চড় মেরেছেন, তিনি নিশ্চয়ই মাদ্রাসায় গিয়ে ওই শিক্ষকের ওপর চড়াও হননি। প্রথমে অভিযোগ করেছেন। তার অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়নি বলেই চড় মেরেছেন।

শিক্ষক অবশ্য গ্রেফতার হয়েছেন। তবে একদল দেখছি শিশুকে আদর করা কতটা ঠিক, কতটা জায়েজ—তা নিয়ে জ্ঞান বিতরণ করছেন। শিশু ও নারী নির্যাতন দমন আইনেও কিন্তু বিষয়টা স্পষ্ট করা হয়েছে—যৌন উদ্দেশ্যে স্পর্শ করা, শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন করা, কিংবা তার নিরাপত্তা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এমন আচরণ আইনত অপরাধ। তো ওই শিক্ষকের চুমুকে নিশ্চয়ই শিশুটি নিরাপদ মনে করেনি।

একটি শিশু, একেবারে ছোট বয়সে কিছু বুঝতে না পারলেও অস্বস্তিটা ঠিকই বোঝে। আত্মীয়ের বাড়িতে ছোট্ট শিশুকে দেখলে কোলে তুলে নেওয়া, গালে চুমু দেওয়া, কিংবা জড়িয়ে ধরার দৃশ্য আমাদের সমাজে খুবই পরিচিত। অনেক সময় পরিচিত-অপরিচিত মানুষও শিশুকে আদর করতে এগিয়ে আসেন। শিশুটি তাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে কিনা, তার সম্মতি আছে কিনা, তা নিয়ে আমরা বিশেষ মাথা ঘামাই না। বরং শিশু আদর নিতে না চাইলে অনেক সময় বাবা-মা তাকে বকা দেন।

অথচ শিশুকে সবার কোলে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাবা-মায়ের সচেতন হওয়া দরকার। আর কোনও শিশু অস্বস্তি প্রকাশ করলে সেই বিষয়ে তাদের আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। শিশু কিন্তু আমাদের খেলনা নয়। সে সম্পূর্ণ আলাদা একজন ব্যক্তি হিসেবে বেড়ে ওঠে। আর শৈশব থেকেই তার ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে। তাই শিশুর বেড়ে ওঠার পরিবেশটা অবশ্যই নিরাপদ হওয়া উচিত।

আমাদের অনেক বাবা-মাই জানেন না শিশুর জন্য কোনটি নিরাপদ স্পর্শ আর কোনটি অনাকাঙ্ক্ষিত বা অনিরাপদ স্পর্শ। সন্তানকে কী শেখাবেন, যদি নিজেরাই বিষয়টি না জানেন? পরিবারের পর শিশুকে নিরাপদ আচরণ শেখানোর দায়িত্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদেরও। কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন শিক্ষকই আদরের নামে শিশুর ব্যক্তিগত সীমা লঙ্ঘন করেন।

শিশুর প্রতি অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের অভিযোগ উঠলে অনেকেই প্রশ্ন করেন—একজন শিক্ষক বা সম্মানিত ব্যক্তি এমন কাজ করবেন কেন? তিনি কি বুঝতে পারেন না যে তার আচরণে একটি শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে? এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। শিশুর অস্বস্তি উপেক্ষা করা, জোর করা কিংবা যৌন উদ্দেশ্যে শিশুর শরীর স্পর্শ করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। অনেকে সামাজিকভাবে প্রচলিত এমন আচরণকে স্বাভাবিক মনে করেন। কারণ তারা নিজেরাও এ বিষয়ে সচেতন নন। কেউ নিজের ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের অপব্যবহার করেন। আবার যৌন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণের পেছনে থাকতে পারে শিশুর প্রতি যৌন আগ্রহ, সুযোগের অপব্যবহার কিংবা নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, মানসিক বিকৃতি।

মনোবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানে এই ধরনের মানসিক অবস্থাকে ‘পেডোফিলিয়া’ বলা হয়। এটি এমন একটি মানসিক বা যৌন সমস্যা—যেখানে কোনও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ কাজ করে।

যার এই সমস্যা থাকে, তিনি সহজেই বা কোনও চিকিৎসার মাধ্যমে রাতারাতি ভালো হতে পারেন না। তবে চিকিৎসা ও সচেতনতার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার আচরণকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন, যাতে কোনও শিশুর জীবন বিপন্ন না হয়। আর এ জন্য সবার সচেতনতা যেমন দরকার, তেমনই শিশু সুরক্ষার জন্য আইনের বাস্তবায়ন ও কঠোর প্রয়োগও দরকার।

শিশুকে ছোটবেলা থেকেই সহজ ভাষায় শেখাতে হবে তার শরীর তার নিজের। কেউ তাকে জোর করে কোলে নিতে চাইলে, চুমু খেতে চাইলে কিংবা এমনভাবে স্পর্শ করলে যাতে সে অস্বস্তিবোধ করে, সে আপত্তি জানাতে পারে। প্রয়োজনে সেখান থেকে সরে এসে মা-বাবা বা বিশ্বাসযোগ্য কোনও বড় মানুষকে জানাতে পারে।

গুড টাচ ও ব্যাড টাচ সম্পর্কে ধারণা থাকলে হয়তো ওই শিক্ষকও এমন আচরণ করতেন না—যদি তিনি এই মানসিক বিকৃতির বাইরেও কেবল অসচেতন হয়ে থাকেন। কারণ অনেক ঘটনাই ঘটে অজ্ঞতা থেকে। হয়তো ওই শিক্ষকও জানেন না শিশুরও ব্যক্তিগত সীমা আছে। এ শিক্ষা শুধু শিশুদের জন্য নয়, বাবা-মায়েরও প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা এ বিষয়ে আগে কখনও জানার সুযোগ পাননি, তাদের কাছে সহজ ভাষায় তথ্য পৌঁছে দিতে হবে।

শিশুর আপত্তিকে সম্মান করা, তার আচরণের পরিবর্তন লক্ষ করা এবং কোনও অভিযোগ শুনলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়—এসব বিষয় তাদের জানতে হবে। কোনও শিশু অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের কথা জানালে প্রথমেই তাকে শান্তভাবে শুনতে হবে, তাকে দোষারোপ করা যাবে না। আবার শিশুর সুরক্ষার দায়িত্ব কেবল বাবা-মায়ের নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র—সব পক্ষেরই এখানে ভূমিকা রয়েছে। স্কুল, মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার স্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।

শিক্ষক ও কর্মীদের শিশুদের সঙ্গে নিরাপদ আচরণ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অভিযোগ জানানোর গোপনীয় ও শিশুবান্ধব ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে কোনও শিশু ভয় ছাড়াই নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে পারে। অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা (শিশু আইন, ২০১৩ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী) নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে অভিভাবকদের জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো যেতে পারে। টেলিভিশন, রেডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্কুলের অভিভাবক সভা, মসজিদ-মাদ্রাসা ও কমিউনিটির আলোচনার মাধ্যমে সহজ ভাষায় শিশু সুরক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

শিশুকে ভালোবাসার অর্থ শুধু তাকে কোলে নেওয়া বা চুমু খাওয়া নয়; তার অস্বস্তি বোঝা, তার ‘না’ বলার অধিকারকে সম্মান করা এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আর শিশুর ‘না’ বলার অধিকারকে সম্মান করতে শেখার মধ্য দিয়েই শুরু হোক আমাদের সচেতনতা।

লেখক: সাইকোলজিস্ট

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ইসরায়েলে ভোট গ্রহণ শুরু, নেতানিয়াহু-আইজেনকট হাড্ডাহাড্ডি লড়ায়ের আভাস
ইসরায়েলে ভোট গ্রহণ শুরু, নেতানিয়াহু-আইজেনকট হাড্ডাহাড্ডি লড়ায়ের আভাস
‘বিগ বি’ উদ্যোগ যৌথভাবে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ-জাপান একমত
‘বিগ বি’ উদ্যোগ যৌথভাবে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ-জাপান একমত
সবার ওপরে কেইন, মেসি-এমবাপ্পেরা কত নম্বরে?
সবার ওপরে কেইন, মেসি-এমবাপ্পেরা কত নম্বরে?
পশুর নদীতে কয়লাবোঝাই কার্গো জাহাজডুবি
পশুর নদীতে কয়লাবোঝাই কার্গো জাহাজডুবি
সর্বশেষ সর্বাধিক